Wednesday , January 17 2018
Breaking News
Home / উপসম্পাদকীয় / ভারতীয় সিরিয়াল ভাঙছে পরিবার পশ্চিমা সংস্কৃতি বাড়াচ্ছে অশ্লীলতা
15747624_1292404987514129_7087109343622771281_n

ভারতীয় সিরিয়াল ভাঙছে পরিবার পশ্চিমা সংস্কৃতি বাড়াচ্ছে অশ্লীলতা

15747624_1292404987514129_7087109343622771281_nএকুশ বিডি : আশঙ্কা অবশেষে সত্যে পরিণত হয়েছে। বিপদ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেছে। ভারতীয় টিভি সিরিয়াল দেখা নিয়ে মহিলার মৃত্যুর ঘটনাও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। একজন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের প্রতিক্রিয়ায় আমাদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সচেতন মহল ও বিশিষ্টজনেরা বহু আগে থেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, ভারতীয় টিভির সিরিয়াল নাটকগুলো আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিবার প্রথাকে বিপন্ন করছে। মূলত পারিবারিক ষড়যন্ত্র, পরকীয়া, চক্রান্ত, ব্যক্তিগত ঈর্ষা, দ্বন্দ্ব ইত্যাদি অতি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের টিভি নাটক ও সিরিয়ালগুলো নির্মিত হচ্ছে। ভাষার নৈকট্যের কারণে এবং নির্মাণের চটকদারিত্বের জন্য এদেশের মানুষ নাটকগুলো দেখে। সস্তা উপাদানের কারণে জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে সেগুলো। কিন্তু এর ফলে যে বড় বড় ক্ষতি হচ্ছে, সেটার কথা ভাবা হচ্ছে না। মানুষে মানুষে সঙ্কট তৈরির পাশাপাশি পরিবার ব্যবস্থার মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস পয়দা করছে নাটকগুলো। যেহেতু ভারত একটি ভিন্ন সংস্কৃতির দেশ এবং ভারতের বাঙালিরা ধর্ম ও সংস্কৃতিগত দিক থেকে ভিন্ন জীবনধারা ও বিশ্বাসের অধিকারী, সেহেতু সেসবের ছাপও এখানে পড়ছে। অনেকেই অন্ধভাবে অনুকরণও করছে সেসব। পোশাকে-আশাকে, আচারে-ব্যবহারে, আচরণে প্রচারিত ভারতীয় বিভিন্ন চ্যানেলে নাটকের বিষয়বস্তু, কথাবার্তা, রঙ-ঢঙ-এর প্রভাব সমাজের স্থিতি ও স্বাভাবিকতা ক্ষুণœ করছে।
মিডিয়া এমনিতেই একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম, যার দ্বারা সামাজিক চিন্তা ও আচরণের রূপান্তর সাধন করা সম্ভব। আমাদের দেশের মিডিয়া সেটা পারছে না। বরং ভারতের মিডিয়া তাদের চিন্তা ও আচরণকে মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত করছে। নাটকের অনুকরণে নানা স্থানে ঝগড়া-ফ্যাসাদের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীন প্রচারের সুযোগ নিয়ে ভারতের মিডিয়া ঘরে ঘরে ঢুকে তা-ব সৃষ্টি করছে। পারিবারিক সম্প্রীতি ও শান্তির পরিবেশে নাটকের মধুমাখা ভাষায় চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের বিষ মিশাচ্ছে।
ভারতের মিডিয়ার মতোই পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব সমাজে চরমভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পশ্চিমা সমাজের অশ্লীলতার নানা বিষয় আমাদের সমাজেও ফুটে উঠেছে। বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক, উগ্র পোশাক ও জীবনাচারের প্রচলন সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে। সামনে থার্টি ফার্স্ট নামক অনুষ্ঠান অপেক্ষমাণ। ইংরেজি বছর শেষে নতুন বছরকে আমন্ত্রণের একটি নোংরা রেওয়াজ ক্রমেই বাড়ছে। সারা রাত হৈ-হুল্লোড় আর মাতামাতির একাকার কাণ্ড ঘটে তখন। ৩১ ডিসেম্বর রাতে কোনো ভদ্রলোক রাজধানী ঢাকার গুলশান-বনানীতে যেতে ভয় পায়। সেখানে উঠতি বড় লোকের বেয়াড়া পুত্র-কন্যাগণ জোরে গাড়ি চালিয়ে আর উচ্চকণ্ঠে ইংরেজি সঙ্গীত বাজিয়ে নরক গুলজার করে। পরের দিন সেখানকার পথ-ঘাট থেকে শত শত খালি মদের বোতল উদ্ধার করতে হয় ধাঙ্গরদের। পুলিশকে নিতে হয় বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। তারপরেও নানা অপ্রীতিকর এবং অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা থামানো যায় না।
এইসব পরিস্থিতি বাইরের দিক থেকে আসা আগ্রাসনের নগ্ন চিত্র। ভারতীয় বোম্বাইয়া আর কলকাতার নাটক-সিরিয়ালের কুপ্রভাব এবং পশ্চিমা ভোগবাদের বিকৃত প্রকাশই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের উদ্দেশ্য। বাংলাদেশে নানা কারণে, বিশেষত রাজনৈতিক সুবিধা পেয়ে গজিয়ে ওঠা নব্য-ধনবান শ্রেণিটি সমাজ-সংসার-ধর্ম-সংস্কৃতি-মূল্যবোধকে কাঁচকলা দেখিয়ে বাইরের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এজেন্ট হিসাবে যাচ্ছে-তাই করে চলেছে। বাংলাদেশের ভেতরেই বিকৃতিতে পরিপূর্ণ এবং সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্নধর্মী আরেকটি সমাজ বানানো হয়েছে, যাদের জীবনবোধ ও চর্চা সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের বিপরীত এবং সুস্থতার জন্য মারাত্মক হানিকর। এই বিকৃতি অচিরেই ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে, যদি না একে যথাসময়ে ও যথাবিধিতে দমন করা না হয়। কিন্তু দমনের কাজটি কে করবে? কর্তারা যদি এদের সঙ্গে লাফান তো বানরকে থামাবে কে?
আগ্রাসন নিয়ে সব সময়ই কথা বলা হয়। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মিডিয়া আগ্রাসন এখন আর লুকোনো বিষয় নয়, চোখের সামনেই সবকিছু দেখা যাচ্ছে। নানা ক্ষেত্রেই এসবের প্রয়োগ স্পষ্ট। দিনে দিনে আগ্রাসনের মাত্রা কমার বদলে বাড়ছেই। একতরফা চলমান আগ্রাসন রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে থামানোও যাচ্ছে না। বলদর্পী আগ্রাসনের দাপটে নাকাল সবাই। আতঙ্ক ও ভীতির বিষয়টিও আছে। ফলে আগ্রাসী পরিস্থিতি অপ্রতিরোধ্য।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আগ্রাসন যখন পরিবারের ওপর হামলা করছে, সমাজ ও সংস্কৃতি ভেঙে দিচ্ছে, তখন করণীয় কি? দিনে দিনে সমাজের নারী, পুরুষ, তরুণ, তরুণীরা উচ্ছন্নে যাবে আর দায়িত্বশীল অভিভাবকরা সেটা মেনে নেবেন? এমনটি হলে তো ধ্বংস অনিবার্য। ধ্বংসকে থামানো না হলে ধ্বংসের কবলে সকলেই নিপতিত হবে, এটাই স্বাভাবিক।
এটা ঠিক যে, তরুণ প্রজন্ম এমনিতেই রোমাঞ্চপ্রিয় এবং আবেগপ্রবণ। তাদেরকে উস্কে দেওয়াও সহজ। গভীর বিবেচনা বোধ তরুণ বয়সে তৈরি হয় না। ইতিহাস, দর্শন, মূল্যবোধের দিক থেকেও এই প্রজন্ম খানিকটা বেখেয়াল। বরং জীবন ও যৌবনকে দেখার আর উপভোগের লিপ্সাই তাদেরকে আচ্ছাদিত করে রাখে। এমন সময় যদি নৈতিক বল বাড়ানোর বদলে তাদেরকে গড্ডালিকায় ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে তো সর্বনাশের চূড়ান্ত। ভারতের সিরিয়াল এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির নানা উপাদান মূলগত অর্থে একটি ভোগবাদী আবহের পক্ষে প্ররোচিত করে। এই ভোগবাদ জীবনকে কেবল ইহলোকের সীমিত গন্ডিতে আবদ্ধ করে। ‘খাও-দাও-ফুর্তি কর’-এই মন্ত্রে সবাইকে দীক্ষিত করতে চায়। সমাজ-সংসার-পরিবার-পরিজনের প্রতি দায়িত্ব পালনকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে। নিজের ছাড়া অন্যের জন্য কিছু করার ক্ষেত্রে এই প্রজন্ম অনীহা প্রকাশ করে। যে কারণে ইউরোপ-আমেরিকায় বাবা-মা থাকেন নিভৃত ওল্ডহোমে। সন্তানরা কোনো দায়িত্ব নেয় না পিতা-মাতার।
অতীব দুঃখের বিষয় হলো, পশ্চিমের সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিকতার পতন এখানেও দৃশ্যমান হচ্ছে। বহু তরুণই এখন চাকরিজীবনে নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করে নিজেকে নিয়ে গুটিয়ে আছে। অফিস আর ঘর, এই হলো তার জীবনের চৌহদ্দী। সেই চৌহদ্দীতে মহাশক্তিতে অধিষ্ঠিত রয়েছে একটি জমকালো টিভি সেট। দিনের শেষে রাতের পুরোটা সময়ই কব্জা করছে টিভির মাধ্যমে আগত নানা নাটক-সিরিয়াল, যার মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে ভারতীয় অতিনাটকীয়-স্পর্শকাতর পারিবারিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত-ষড়যন্ত্রের সিরিয়ালগুলো। অবস্থা এমনই হয়েছে যে, সিরিয়াল দেখার জন্য প্রতিযোগিতা হয়। প্রচণ্ড আগ্রহ সৃষ্টি হয় মেয়েদের মধ্যে। তখন ফোনে কথা বলা, মেহমান আপ্যায়ন বা অন্য কোনো কাজ করতেও আগ্রহী হয় না কেউ কেউ। মনে হয় জীবনের সার্থকতাই লুক্কায়িত রয়েছে এহেন নাটক দেখায়! এসব নিয়ে ঝগড়া মারপিটও হচ্ছে।
প্রসঙ্গত আগ্রহ আর নেশা নিয়েও ভাবনার দরকার আছে। আগ্রহ এক জিনিস আর নেশা অন্য। আগ্রহ বলতে ইন্টারেস্ট নামক ইংরেজি শব্দ ব্যবহৃত হয়। নেশার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় এডিকশন। আগ্রহ মানে হলো, মূল কাজের পর বিশেষ দিকে পছন্দ। যেমন, বাগান করা, বইপড়া, সাঁতার কাটা, দেশ ভ্রমণ, সাইকেল চালনা ইত্যাদি। আগ্রহ যখন অদম্য ও অপ্রতিরোধ্য হয়, তখন সেটাকে নেশা বলে। সাইকেল চালনা ভালো আগ্রহ কিন্তু সেটা যদি কেউ ২৪ ঘণ্টাই করতে চায় তখন নেশায় রূপান্তরিত হয়। মূল কাজের চাপে মানুষের আগ্রহে ভাটা পড়ে বা আগ্রহের মাত্রা ও পরিধি মানুষ সীমিত করে। কিন্তু নেশাকে সীমিত করা যায় না। পেতেই হয়। না পেলে চরম অবস্থা হয়। মাদকসহ অপরাপর নেশাগ্রস্তদের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
ভারতীয় টিভি সিরিয়াল আর পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ এখন মনে হচ্ছে নেশার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। নিজেকে জাতে-উঠাতে বা নিজেকে ভোগ করতে এমনটি করছে অনেকেই। মজা নেয়ার মতো এই আগ্রহ যে দিনকে দিন নেশায় পরিণত হচ্ছে, সেটা অনুভব করতে পারছে না দর্শকরা। ভারতীয় সিরিয়ালের জন্য খুন-খারাবি বা সংসার ভাঙা বা অশান্তির ঘটনাতেও টনক নড়ছে না অনেকেরই। অন্যদিকে পশ্চিমা সংস্কৃতির ভোগবাদ, পোশাক-পরিচ্ছদ-জীবনধারার কুপ্রভাবে অশ্লীলতা, বেলেল্লাপনার মচ্ছব শুরু হয়েছে। বাড়ছে বিবাহ-বিচ্ছেদ, অনৈতিক জীবন-যাপনের অন্ধকারময়তা, রোগ, শোক, বিকৃতি এবং নানা অনাচার। সমাজের মধ্যে এইসব নেতিবাচক পরিবর্তন খুবই দ্রুত গতিতে বাড়ছে। শত শত চ্যানেলের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে সুকৃতি ও সুস্থতা।
আগ্রাসনের এই পাগলা ঘোড়া আমাদেরকে কোন অজানায় ভাসিয়ে নেবে? আমাদেরকে কোন অন্ধকারে ঠেলে দেবে? আমাদের সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে কোন কালো গহ্বরে নিমজ্জিত করবে? বহুযুগের ঐতিহ্যলালিত আমাদের আলোকিত সমাজকে ধীরে ধীরে পর্যবসিত করবে কোন অমানিশার অসুস্থ জগতে? রাষ্ট্র-সমাজ-অর্থনীতি-ধর্ম-দর্শন নিয়ে যারা ভাবেন, শুধু তারাই নন, প্রতিটি সচেতন নাগরিককেই এসব প্রশ্ন সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে। কারণ এসব প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অস্তিত্বের প্রসঙ্গ।

Check Also

ZJ

শহীদ জুনাইদ জমশেদ রহ -এর জীবন ও কর্ম : সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ

সংগীতজ্ঞ জুনায়েদ জামশেদ ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে জন্ম গ্রহণ করেন। গতকাল প্রিয়তমা জীবনসঙ্গিনী সহ এই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *